February 26, 2024

অবহেলায় হাজারো স্মৃতি নিয়ে দাড়িয়ে আছে দুবলহাটি রাজবাড়ী

নওগাঁ জেলা প্রচীনকাল হতেই বৈচিত্রে ভরপুর। নদীবহুল এ জেলা কৃষি কাজের জন্য প্রসিদ্ধ। কৃষি কাজের জন্য অন্যতম উপযোগী এলাকায় বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে অসংখ্য জমিদার গোষ্ঠী গড়ে উঠে। নানা জাতি ও নানা ধর্মের মানুষের সমন্বয়ে গঠিত নওগাঁ জেলা মানব বৈচিত্রে ভরপুর । অসংখ্য পুরাতন মসজিদ , মন্দির,গীর্জা ও জমিদার বাড়ি প্রমাণ করে নওগাঁ জেলা সভ্যতার ইতিহাস অনেক পুরাতন ।

নেই রাজা , নেই রাজ্য। তবুও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নওগাঁ জেলার অনেক রাজবাড়ীর ধ্বংসাবশেষ। আছে দেবালয়, সেখানে হয় না আর নিয়মিত পূজা-অর্চনা। দেবালয়ে দেবতার সন্তুষ্টিতে দেবদাসীদের নৃত্যাঞ্জলি, শঙ্খধ্বনি, পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ, ধূপের ধোঁয়া আর খোল করতালের শব্দ থেমে গেছে বহু আগে।

তেমনি আলোড়ন জাগানো ঐতিহাসিক স্থান দেশের উত্তর জনপদের নওগাঁ জেলার অন্তর্গত দুবলহাটি রাজবাড়ি। জেলা সদর থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে এই রাজবাড়িটির অবস্থান। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অযত্ন আর অবহেলার কারণে ২শ বছরের পুরোনো এই রাজবাড়িটি বর্তমানে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে আগাছা আর জঙ্গলে পরিপূর্ণ। কালি মন্দির থেকে মাত্র ৫শ গজ উত্তরে ছিল রাজার বাগান বাড়ি। বাগানবাড়ি এলাকা জুড়ে ছিল আম বাগান। স্থানীয়রা এই বাগানবাড়িকে ছোট রাজবাড়ি বলত।

সৃষ্টি আর ধ্বংসের খেলায় এগিয়ে চলছে পৃথিবী। কেউ মত্ত সৃষ্টিতে আবার কেউ মত্ত ধ্বংসের খেলায়। অবহেলা আর দায়িত্বহীনতার কারণে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে অতীত ঐতিহ্যের কিছু স্মৃতি চিহ্ন। এসব ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো আমাদের তথা বাঙালির সত্ত্বাতে আলোড়ন সৃষ্টি করে আজও।

প্রতিটি রাজা ও রাজবাড়ীর ইতিহাস রয়েছে তেমনি দুবলহাটি রাজবাড়ীরও ইতিহাস রয়েছে। স্থানীয়দের মতে রঘুনাথ নামের এক ব্যক্তি এ এলাকায় লবণ ও গুড়ের ব্যবসা করতেন। তিনি দীঘলি বিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খয়রা নদী দিয়ে নৌকা যোগে দুবলহাটিতে ব্যবসার জন্য আসেন। তিনি প্রায় প্রতিরাতে স্বপ্ন দেখতেন তাঁকে কে যেন বলছে, তুই যেখানে নৌকা বেঁধেছিস সেখানে জলের নিচে রাজ রাজেশ্বরী দেবীর প্রতিমা রয়েছে। সেখান থেকে তুলে স্থাপন কর। রঘুনাথ একদিন ভোরবেলা জলে নেমে দেখলেন সত্যিই সেখানে রাজ রাজেশ্বরীর প্রতিমা আছে। তিনি প্রতিমাটি জল থেকে তুলে একটি মাটির বেদী তৈরি করে প্রতিষ্ঠা করলেন। এরপর তার ব্যবসায় ব্যাপক উন্নতি হতে থাকে।

অন্য ঐতিহাসিকদের মতে, দুবলহাটি জমিদার বংশের প্রতিষ্ঠাতা জগতরাম একজন লবণ ব্যবসায়ী, বাণিজ্য উপলক্ষে দুবলহাটির কাছের গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন এবং বিল অঞ্চলের ইজারা পত্তন গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে তারা প্রচুর জমির মালিক হন। কথিত আছে যে, এই অঞ্চলে তেমন কোন ফসল উৎপাদন না হওয়ায় ভুমা মহল অজুহাতে দুবলহাটির জমিদার কই মাছ দিয়ে কর পরিশোধ করতেন। মাত্র ২২ কাহন কই মাছ কর হিসেবে দিতেন। রঘুনাথের বিত্ত-বৈভবের খবর পৌঁছে যায় মোগল দরবারে। মোগল দরবারের নির্দেশে তাকে ডেকে পাঠানো হয় মুর্শিদাবাদ নবাবের দরবারে। নবাব তাকে রাজস্ব প্রদানের নির্দেশ জারি করেন। তিনি নবাবকে জানান, তিনি যে এলাকায় থাকেন সেখানে শুধু জল আর জল। কোন ফসল হয় না। তবে বড় বড় কৈ মাছ পাওয়া যায়। বিষয় বুঝতে পেরে নবাব তাকে প্রতি বছর রাজস্ব হিসাবে ২২ কাহন কৈ মাছ প্রদানের নির্দেশ দেন।

ইতিহাস বলছে, ১৭৯৩ সালে রাজা কৃষ্ণনাথ লর্ড কর্নওয়ালিসের কাছ থেকে ১৪ লাখ ৪৯৫ টাকা দিয়ে পত্তন নিয়ে এ রাজ্য পরিচালনা শুরু করেন। রাজা কৃষ্ণনাথ নিঃসন্তান হওয়ায় তার পরে ১৮৫৩ সালে রাজত্বভার গ্রহণ করেন তার ‍দূরসম্পর্কের নাতি হরনাথ রায়। রাজা হরনাথের আমলে দুবলহাটির রাজ্যের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। দুবলহাটি রাজপ্রাসাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, নাট্যশালা নির্মাণ ও প্রজাদের সুপেয় পানীয় জলের কষ্ট দূর করতে রাজপ্রাসাদের পাশের এলাকায় অনেক পুকুর খনন করেন রাজা। ১৮৬৪ সালে রাজপরিবারের উদ্যোগে একটি স্কুল স্থাপন করা হয়। পরে স্কুলটির নাম রাজা হরনাথ উচ্চ বিদ্যালয় রাখা হয়। হরনাথ রায় চৌধুরী রাজা খেতাব পেয়েছিলেন। আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুবিশাল অট্টালিকাটি। রাজবাড়ির মূল ফটকে রোমান স্টাইলের স্তম্ভগুলো রাজাদের রুচির পরিচয় বহন করে। রাজবাড়িতে সব মিলিয়ে ৭টি আঙিনা এবং প্রায় ৩০০ ঘর ছিল। প্রাসাদের ভেতরে ভবনগুলো কোনটি তিনতলা, কোনটি চারতলা। রাজবাড়িতে এখনও শান বাঁধানো একটি কুয়া রয়েছে। রাজবাড়ির সামনে রয়েছে গোবিন্দ পুকুর, যার পাশে ছিল এলাকায় প্রচলিত ‘গান বাড়ি’ নামক ভবন। রাজাদের জৌলুস রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখেও বোঝা যায় অনায়াসে।

১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দ এর দিকে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর রাজা হরনাথ রায় সপরিবারে চলে যান ভারতে। রাজবংশের স্মৃতিস্বরূপ থেকে যায় বিশাল সুরম্য অট্টালিকা দুবলহাটি রাজবাড়ী। পরবর্তীতে এটি সরকারি সম্পদ হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ নিজেদের অধীনে নেয়।

বর্তমানে রাজবাড়ির প্রধান গেটের পাশে আবাস গড়ে তুলেছে এক ছিন্নমূল পরিবার। জমিদারি বিলুপ্ত হওয়ার পর সরকার এই রাজবাড়িকে সরকারি সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করে দেখভালের দায়িত্ব দেয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ দায়িত্ব গ্রহণ করলেও এই সম্পদটি রক্ষণাবেক্ষণ বা সংস্কারের কোন উদ্যোগ নেয়নি এখনও। স্থানীয় প্রভাবশালীদের কবলে পড়ে দিনের পর দিন রাজবাড়ির মূল্যবান সম্পদ চুরি ও লুটপাট হয়ে যাচ্ছে। মূল্যবান দরজা, জানালা, শাল কাঠের তীর লুট করে নিয়ে যাওয়ার পর দালানের ইট খুলে নিয়ে এলাকার অনেকেই বাড়ি তৈরি করেছে।

স্থানীয়রা বলছেন, অবহেলা আর অযত্নে ধ্বংসের দারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দুবলহাটি রাজবাড়িতে এখন সকাল-সন্ধ্যা চলে অসামাজিক কার্যকলাপ। অবাধে চলছে মদ, জুয়া আর গাঁজার আড্ডা। সেই সঙ্গে প্রচলিত হয়ে উঠেছে ইয়াবা, হেরোইন, নেশাজাত ইনজেকশন আর রাতের আঁধারে দেহ ব্যবসা। স্থানীয়দের মতে এই রাজবাড়ি এখন হয়ে উঠেছে অসামাজিক কার্যকলাপের উন্মুক্ত কেন্দ্রবিন্দু। এগুলো যেন দেখার মত কেউ নেই। তারা বলেন, বর্তমানে এই ঐতিহাসিক রাজবাড়িটির সংস্কারের প্রয়োজন। এটি সংস্কার করা হলে রাজবাড়িকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

রির্পোটার, ফ্ল্যাস নিউজ

তাহসিব আলম শাহ

About The Author

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *